বিটকয়েন

বিটকয়েন

ক্রিপ্টোকারেন্সি এর আদ্যেপান্ত

সাধারণত কাগজের তৈরি মুদ্রা বা এ সংক্রান্ত মুদ্রাগুলো দিয়ে আমরা দৈনন্দিন জীবনের লেনদেন মিটিয়ে ফেলতে পারি। ডেবিট কিংবা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে অনলাইনে পেমেন্ট বা শপিং ও কোনপ্রকার ঝামেলা ছাড়া করা যায়। তবে বর্তমানে ব্যবহৃত এটিএম কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড অথবা অন্য ডিজিটাল স্বাক্ষর সম্বলিত বস্তুগুলো ব্যবহারে দুটি বড় সমস্যা রয়েছে।

এসব লেনদেনের ক্ষেত্রে গ্রাহক এবং গ্রহীতা উভয়কেই তৃতীয় কোন প্রতিষ্ঠানের উপর আস্থা রাখতে হয়। যা লেনদেনের জন্য একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। গ্রাহক এবং গ্রহীতা উভয়ই এই লেনদেন সম্পন্ন করার জন্য তৃতীয় পক্ষকে একটি নির্দিষ্ট অংকের অর্থ পরিশোধ করে থাকে । ইংরেজিতে যাকে বলে ডাবল স্পেন্ডিং। এই সমস্যা মোকাবেলার জন্য সাতোশি নাকামোতো নামক এক জাপানিজ ছদ্মনামে “Bitcoin: A Peer-to-Peer Electronic Cash System” নামক এক গবেষণা প্রস্তাব অনলাইনে প্রকাশ করে। প্রস্তাবনার সারসংক্ষেপ এ বলা হয়”লেনদেন করার জন্য গ্রাহক কিংবা গ্রহীতা তৃতীয় কোন মাধ্যম ছাড়াই লেনদেন করতে পারবে এবং এ লেনদেন এ আস্থার পরিবর্তে কাজের প্রমাণ কে মূল্যায়ন করা হবে”। এ লেনদেন সংঘটিত হবে ইলেকট্রনিক্স উপায়ে এবং তা একটি নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কে লিপিবদ্ধ থাকবে। এ থেকেই বিটকয়েন সম্পর্কে প্রথম ধারণা পাওয়া যায়। এরপর ই সাতোশি নাকামোতো মাইনিং নামে একটি সফটও্যার তৈরি শুরু করেন এবং ২০০৯ সালে বিটকয়েন প্রথম উন্মুক্ত করে দেন।

 

বিটকয়েন হলো মূলত একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি যাকে আপনি ধরতে ও পারবেন না আবার স্পর্শ করে দেখতেও পারবেন না। এটি একটি ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবস্থা। এটি ওপেন সোর্স প্রটোকলের মাধ্যমে লেনদেন হওয়া একটি সাংকেতিক মুদ্রা। যা প্রচলিত মুদ্রা ব্যবস্থার চাইতে পুরোপুরি ভিন্ন। এটি লেনদেনের বা নিয়ন্ত্রণের জন্য কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন পড়ে না।

বিটকয়েন

বিটকয়েন মাইনার নামক একটি সার্ভার কর্তৃক এর লেনদেন সুরক্ষিত থাকে। এখন মনে প্রশ্ন হতে পারে এই ডিজিটাল কারেন্সি উৎপন্ন হয় কিভাবে? এবং লেনদেন হয় কিভাবে? বিটকয়েন কিভাবে উৎপন্ন হয় তার ব্যাখ্যা টি একটু জটিল। সহজ ভাষায় বললে পিয়ার টু পিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত থাকা মোবাইল,কম্পিউটার ইত্যাদির মধ্যে কোন বিটকয়েন লেনদেন হলে এর কেন্দ্রীয় সার্ভার এর লেজার হালনাগাদ করে নেয় এবং সাথে সাথে নতুন বিটকয়েন উৎপন্ন হয়। এর ফলে বিটকয়েন এর সংখ্যা যেমন বেড়ে যাচ্ছে না আবার কমে ও যাচ্ছে না। এটি নিয়ন্ত্রণের মাঝে থাকছে.। ২১৪০ সাল পর্যন্ত প্রতি চার বছর পর পর বিটকয়েন এর সংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসবে এবং ২১৪০ সালের পর ২১ মিলিয়ন বিটকয়েন উৎপন্ন হয়ে গেলে বিটকয়েন হালনাগাদ হওয়া থেমে যাবে। এর ফলে নতুন করে আর কোন বিটকয়েন উৎপন্ন হবে না।

বিটকয়েন লেনদেন বা নিয়ন্ত্রণের জন্য যেহেতু কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন পড়ছে না তাই যে কেউ চাইলেই পরিচয় গোপন করে যে কোন পণ্য কেনা বেচার জন্য এই ডিজিটাল কারেন্সি ব্যবহার করে থাকে। এতে করে ব্যবহারকারীর তথ্যের গোপনীয়তা শতভাগ নিশ্চিত হয়। পিয়ার-টু-পিয়ার ব্যবস্থার কারণে কোন প্রতিষ্ঠান বা মিডলম্যান ছাড়াই সরাসরি লেনদেন সম্পন্ন হয়। ক্রিপ্টোগ্রাফি ব্যবহৃত হওয়ার কারণে উপযুক্ত অনুমতি ছাড়া বিটকয়েনের অ্যাকসেস নেওয়া  অসম্ভব।  সর্বোপরি, বিটকয়েনে  সম্পূর্ণরূপে ছদ্মনামে লেনদেন সম্ভব।

পিয়ার-টু-পিয়ার নেটওয়ার্ক হওয়ার কারণে বিটকয়েনের ট্রানজিকশন বা লেনদেন সেবা দাতা ও গ্রহিতার ‘ওয়ালেট’ থেকে ‘ওয়ালেটে’ সম্পন্ন হয়। ‘ওয়ালেটে’ বিটকয়েন সঞ্চিত রাখা থাকে। এটি অনলাইন বা অফলাইন দু’রকমেই হতে পারে। একজন বিটকয়েন ব্যবহারকারীকে দুটি ‘কি’ (Keys) ব্যবহার করতে হয়। একটি ‘পাবলিক কি’ (Public Key), এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। অন্যটি ‘প্রাইভেট কি’ (Private key), এটি সর্বদা গোপন থাকে এবং লেনদেনের নিশ্চয়তার জন্য ব্যবহৃত হয়।ট্রানজিকশনের ইতিবৃত্ত একটি উম্মুক্ত খতিয়ানে (পাবলিক লেজার) রেকর্ড করা থাকে, যাকে ‘ব্লক চেইন’ (Block chain) বলে। এক্ষেত্রে ‘পাবলিক কি’ ব্যবহার করা হয় এবং একই লেনদেন একই ব্যবহারকারীর মাধ্যমে পুনরাবৃত্তি করা যায়না। ব্লকচেইনে সর্বপ্রথম ট্রানজিকশনের হিসাব থেকে আজ পর্যন্ত সব হিসাব সংরক্ষিত আছে এবং নিয়মিতভাবে আপডেট হচ্ছে।

তথ্য ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ লেখক ‘কেন হাসের’ মতে, বিটকয়েনের কয়েকটি অপকারিতা রয়েছে।

প্রথমতঃ

লেনদেন পুনরাবৃত্তি না করতে পারার কারণে, সেবা গ্রহিতা সংশ্লিষ্ট সেবা না পেলে, মুদ্রা ফেরত পাওয়ার কোন উপায় নেই।

দ্বিতীয়তঃ

বিটকয়েন ‘ওয়ালেট’ হারিয়ে বা নষ্ট (ড্যামেজ) হয়ে গেলে এটি আর ফিরে পাওয়া যায়না। যেটি আমাদের ব্যবহৃত মানিব্যাগ বা মুদ্রার ক্ষেত্রে প্রজোয্য নয়।

তৃতীয়তঃ

বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে বিটকয়েন খুব বেশি অস্থিতিশীল।

চতুর্থতঃ

যদিও বিটকয়েনর ব্যবহার ক্রমান্নয়ে বাড়ছে, কিন্ত সেটি প্রচলিত মুদ্রার তুলনায় খুবিই সীমিত পরিসরে। সুতরাং এটিকে প্রচলিত মুদ্রায় পরিবর্তন করে ব্যবহার করতে হয়। সর্বোপরি, বিটকয়েনে কোন ক্রেডিট ব্যবস্থা নেই। যদিও এটি একটি ভাল দিক, কিন্ত বর্তমান বিশ্বের অর্থনীতি চলছে ক্রেডিট নির্ভর। ক্রেডিটের উপর ভিত্তি করে আমরা অগ্রীম সেবা নিয়ে থাকি।

সময়ের সাথে বিটকয়েন এর চাহিদা যেমন বেড়েছে তাই একে টেক্কা দিতে এর প্রতিদ্ধন্দী ও এসে গেছে। বর্তমানে ৪৫৪ রকমের ক্রিপ্টোকারেন্সি বিশ্বব্যাপী কমবেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এর মধ্যে Litecoin এবং  Ripple অন্যতম। অন্য ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলো বিটকয়েনের মত এতটা ব্যবহৃত হয়না। আপাতদৃষ্টিতে Litecoin-কে বিটকয়েনের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবা হলেও, এটির সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ।

সম্প্রতি কানাডার ভ্যানকুভ্যারেবিটকয়েন এর প্রথম এটিএম মেশিন চালু করেছে। ধারণা করা হচ্ছে মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে এটি বিটকয়েনকে আরও আগিয়ে নিয়ে যাবে।

বাস্তব জগতে বিটকয়েন এর বিনিময়ে প্রথম কোন পণ্য কেনা হয় ২০১০ সালের ২১ মে, যখন বিটকয়েন ব্যবহারকারী লাসজলো (Laszlo) ১০ হাজার বিটকয়েন মুদ্রার বিনিময়ে ২৫ ডলার মুল্যের একটি পিৎ’জা কেনেন।

 

 

বিশ্বব্যাপী ৩০ হাজার এর বেশি ব্যবসায়ী এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠান বিটকয়েন নেন। মার্কিন শেয়ারবাজার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নাসদাকের তথ্যমতে, ইউএস ভিত্তিক অনলাইন খুচরা বিক্রেতা  Overstock.com, ইউকে ভিত্তিক বিশ্বখ্যাত ব্যবসায়ী রিচার্ড ব্রায়ানসন পরিচালিত বিমান সেবা প্রতিষ্ঠান Virgin Galactic, জনপ্রিয় বিনামূল্যে ব্লগিং প্লাটফরম WordPress,  জনপ্রিয় মোবাইল গেইমিং কোম্পানি Zynga, আন্তর্জাতিক ই-কমারস পেমেন্টস ওয়েবসাইট PayPal, অ্যামেরিকান গাড়ি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান Tesla Motors, অনলাইন ডেটিং ওয়েবসাইট OkCupid, এবং জনপ্রিয় টরেন্ট সাইট The Pirate Bay বিটকয়েনের মাধ্যমের তাদের সেবা আদান-প্রদান করে থাকে

মাদক, চোরাচালান অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা ও অন্যান্য বেআইনি ব্যবহার ঠেকানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডীয় সরকার বিটকয়েনের গ্রাহকদের নিবন্ধনের আওতায় আনার চিন্তাভাবনা করছে।

Comments are closed.