আণবিক বনাম হাইড্রোজেন বোমা

যদি ৩য় বিশ্বযুদ্ধ লেগে যায় তবে তো নিউক্লিয়ার আর হাইড্রোজেন বোমার খেলা দেখা যাবে আর মানুষ হবে শিকার।

বোমা বলতেই আমরা বুঝি মানুষ/পরিবেশ বিধ্বংসী এমন একটি বস্তু যা মুহূর্তের মধ্যেই একটি জনপদ/শহর/এলাকার দৃশ্যপট বদলে ফেলতে সক্ষম। সে প্রভাব কাটিয়ে উঠতে কয়েক দশক লেগে যায়, তার সবচেয়ে জ্বলন্ত উদাহরণ হচ্ছে জাপান, ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৫ সালে জাপান যখন পার্ল হারবারে আক্রমণ করে, তখন ফলস্বরুপ হিরোশিমা-নাগাসাকি তে যুক্তরাষ্ট্রের পারমানবিক হামলার কয়েক দশক পরেও জাপান সেই হামলার প্রভাব পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

“লিটলবয়” ও “ফ্যাটম্যান” নামক দুটো পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণে জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকি লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়, এতটাই ভয়ংকর ছিল সেই বিস্ফোরণের মাত্রা যে জাপান পুরোপুরি দিশেহারা হয়ে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিকট আত্নসমর্পন করে। প্রায় ২ লক্ষ মানুষ মারা যায় এবং এর পারমানবিক তেজস্ক্রিয়তা অনেকদূর (প্রায় ৬৫০০ ফিট) ছড়িয়ে পড়ে ফলস্বরূপ অনেক মানুষ তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে মারা যায়, পঙ্গু হয়ে যায়, আশেপাশের মাটিতে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে চাষাবাদের অযোগ্য হয়ে পড়ে,বর্তমানে সেজন্য এখনো জাপানের অনেক শিশু পঙ্গু হয়ে জন্মগ্রহন করছে।

আমাদের আজকের আর্টিকেলে আণবিক এবং হাইড্রোজেন বোমা এবং এর বিধংসীতার মাত্রা পর্যালোচনাঃ

নিউক্লিয়ার এক্সপার্টদের মতে, ১৯৪৫ সালে ব্যবহার করা পারমাণবিক বোমার তুলনায় হাইড্রোজেন বোমা প্রায় ১০০০ গুন বেশী শক্তিশালী।

পারমাণবিক বোমা যেখানে ফিশন বা অ্যাটম বিভাজনের উপর নির্ভর করে কাজ করে সেখানে অ্যাটমিক  বোমা ফিউশন কিংবা অ্যাটম একত্রীকরণের উপর নির্ভর করে ফলে বিপুল শক্তি উৎপন্ন করা সম্ভব হয়, তারকারাজিও এই উপায়েই শক্তি উৎপাদন করে থাকে।

হাইড্রোজেন বোমার আকার এতই ছোট করা সম্ভব, যে একটি আন্তঃমহাদেশীয় মিসাইলের মাথায় স্থাপন করা সম্ভব যা আণবিক বোমার ক্ষেত্রে অনেকটাই দুরূহ ।

একটি উদাহরণ দিলে এর মাত্রা আরো ভালভাবে বুঝা যাবে আশা করি,

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, লাল অংশে বিস্ফোরণ সংঘটিত হয়েছে যার ফলে সেখানে থাকা জীবদেহে আগুন ধরে যাবে যা ৩য় মাত্রার দহন সম্পন্ন করবে, বাকি কমলা অংশ হল তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার আকার , যেখানে থাকাকালীন মানুষ কয়েক ঘণ্টা কিংবা দিনের মধ্যে মারা যাবে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে।

কারণ হাইড্রোজেন বোমা বিশাল বিস্ফোরণ তৈরি করে, যার শক ওয়েভ, উত্তাপ, তেজস্ক্রিয়তা অনেক বড় এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ফলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আণবিক বোমার থেকে অনেক বেশী হয়।

যেখানে নাগাসাকিতে ফেলা বোমা ১ মাইল রেডিয়াসের মধ্যে থাকা সবাইকে মেরে ফেলেছিল সেই জায়গায় যদি হাইড্রোজেন বোমা ফেলানো হত তবে ৫-১০মাইল এরিয়ার মধ্যে থাকা সবাইকে মেরে ফেলত। মোট কথা আরো অধিক মানুষ মেরে ফেলতে সক্ষম এটি।

যেকোনো আধুনিক শহর ধসিয়ে ফেলার ক্ষমতা রাখে হাইড্রোজেন বোমা। তাই অনেকে এর নাম দিয়েছেন “সিটি কিলার”।

হাইড্রোজেন বোমা আণবিক বোমার ই আপডেট ভার্সন।

আণবিক বোমা ইউরেনিয়াম/প্লুটোনিয়াম নিয়ে কাজ করে যা ফিশন বিক্রিয়ার জন্ম দেয় কিন্তু হাইড্রোজেন বোমা ইউরেনিয়াম/প্লুটোনিয়াম নিয়ে কাজ  তো করেই সাথে হাইড্রোজেনের দুটি আইসোটোপঃ ডিউটেরিয়াম ও ট্রিটিয়াম নিয়ে কাজ করে যা ফিশন ও ফিউশন বিক্রিয়ার জন্ম দেয় একইসাথে।

আণবিক বোমা = ফিশন বিক্রিয়া

হাইড্রোজেন বোমা= ফিশন+ফিউশন বিক্রিয়া

জাপানে ফেলা বোমাগুলো ১০০০০ কিলোটন শক্তিসম্পন্ন টিএনটি এর সমতুল্য কিন্তু হাইড্রোজেনবোমা প্রায় ১০০০০০-কয়েক মিলিয়ন টিএনটির সমতুল্য(পাহাড় ধ্বংসে যে ডিনামাইট ব্যবহার করা হয় সেখানে টিএনটি ব্যবহার করা হয়)।

যদিওবা হাইড্রোজেন বোমা বানানো অনেক কষ্টসাধ্য তাও এটি ওজনে অনেক হাল্কা হওয়ায় অনেক দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে এবং মিসাইলের মাথায় বসানো যায়।

বর্তমানে ৫ টি দেশ এর দাবিদারঃ আমেরিকা, ফ্রান্স, রাশিয়া, চিন, ব্রিটেন।

১৯৫০ সালে আমেরিকা “মাইক” ও “ব্রাভো” নামে দুটি হাইড্রোজেন বোমা পরীক্ষা করে।

ছবিতে এদের তুলনা দেখানো হয়েছে।

বিভিন্ন বোমার মাত্রা দেখানো হয়েছে এই ছবিতে।

২০১৭ সালে উত্তর কোরিয়া দাবি করেছে, যে তারা  মাটির নিচে হাইড্রোজেন বোমার সফল বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম হয়েছে ।  The United States Geological Survey  রিপোর্ট করেছে যে তারা    রিখটার স্কেলে ৬.৩ মাত্রার ভূমিকম্প শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে যা কৃত্তিম এবং নিউক্লিয়ার টেস্টের ফলেই ঘটিত।

প্রায় ১০০ কিলোটন টিএনটির সমতুল্য হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষা তারা সম্পন্ন করেছে যা ১৯৪৫ সালে নিক্ষেপ করা বোমার তুলনায় প্রায় ৫-৬ গুন বেশী শক্তিশালী।

বিভিন্ন পরীক্ষায় ফলাফল ভিন্ন ভিন্ন এসেছে, এক পরীক্ষায় দেখা গেছে এই বিস্ফোরণ মাটির প্রায় ৯০০ মিটার গভীরে করা হয়েছে এবং এর  শক্তির মাত্রা ৩০০কিলোটন এর অধিক যা ধারণার ফলপ্রসূ।

এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক শীতল হতে শুরু করেছে এবং অনেকেই ৩য় বিশ্বযুদ্ধের আগাম আভাস পেতে শুরু করেছেন যা অনেকটাই অমূলক।

তবে এরকম বিধ্বংসী অস্ত্র মানবজাতির জন্য ঘোর অমানিশা বয়ে আনে/আনুক, যা আমরা কোনকালেই চাইনা।

সকলেই সুস্থ এবং মানবজাতিকে টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টায় থাকুক এই আশাই কাম্য।

সোর্সঃ

www.livescience.com

https://www.aljazeera.com

কিছু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা যা ধ্বংস করে দিতে পারত পুরো পৃথিবী

Comments are closed.