পরিবর্তন হলো পৃথিবীর চুম্বকীয় উত্তর মেরুর অবস্থান

পৃথিবীর চুম্বকীয় উত্তর মেরু এতো দ্রুত সরে যাচ্ছে যে , কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েছে আনুষ্ঠানিক ভাবে উত্তর মেরুর নতুন অবস্থান ঘোষণা করতে। উত্তর মেরুর এই ব্যপক পরিবর্তন অত্যাধিক উচ্চতায় বিচরণের ক্ষেত্রে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চুম্বকীয় উত্তর মেরু
চুম্বকীয় উত্তর মেরুর নতুন অবস্থান

ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে, পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের এমন ঘুরে বেড়ানো কিংবা উলটে যাওয়ার ঘটনা আগেও ঘটেছে। পৃথিবীর সমতল থেকে প্রায় ১৮০০ মাইল গভীরে গলিত লোহা আর নিকেলের ঘূর্ণন পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রে জন্য দায়ী। পৃথিবীর বাইরের কেন্দ্রে এসব গলিত ধাতুর অবিরাম প্রবাহ সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন হয়েছে, যার ফলে বাহ্যিক চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের পরিবর্তন ঘটে।

গত কয়েক শতকের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে, উত্তর মেরুর অবস্থান  আরও উত্তরদিকে সরে গেছে। উত্তর মেরুর এই পরিবর্তন গত কয়েক বছরে তরান্বিত হয়েছে, যার ফলে মেরুর এই দ্রুত পরিবর্তন। অবস্থান দ্রুত পরিবর্তন হওয়ার ফলেই কর্তৃপক্ষ এর অবস্থান আনুষ্ঠানিক ভাবে পরিবর্তন করেছে। দ্য ওয়ার্ল্ড ম্যাগনেটিক মডেল  সংস্থা উত্তর মেরুর নতুন অবস্থানটি চিহ্নিত করেছে। সংস্থাটির কাজ হচ্ছে পৃথিবী জুড়ে ন্যাভিগেশন, যোগাযোগ, GPS ইত্যাদি বিষয়গুলো নির্ধারণ করা।

গতানুগতিক ধারায় ওয়ার্ল্ড ম্যাগনেটিক মডেল, প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর তাদের মডেলের হালনাগাদ করে থাকে। ২০১৫ সালে শেষবার হালনাগাদ করা হয়েছিলো। কিন্তু সম্প্রতি চৌম্বক মেরুর এই দ্রুত অবস্থান পরিবর্তনের ফলে, নির্ধারিত সময়ের আগেই এর হালনাগাদ আনতে হয়েছে। বিগত বছর গুলোয়, উত্তর মেরু রাশিয়ার দিকে বছরে প্রায় ৩৪ মাইল করে আগাচ্ছে। মাত্র অর্ধ-শতাব্দী আগে যা ছিলো বছরে ৭ মাইল করে।

পৃথিবীর চৌম্বকীয় উত্তর মেরু দ্রুতই ক্যানাডিয়ান আর্কটিক থেকে রাশিয়ার দিকে সরে আসছে। নানান সরকারি এজেন্সিগুলো  মডেলটির হালনাগাদের যথার্থতা নিশ্চিত করছে। বিশেষ করে নাসা, ফ্যাডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ইউ.এস ফরেস্ট সার্ভিস প্রতিনিয়তই তাদের কর্মক্ষেত্রে ম্যাপিং থেকে শুরু করে এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রন করতে চৌম্বকীয় মেরুগুলো ব্যাবহার করে আসছে। এছাড়াও স্মার্টফোনগুলোতে উত্তর মেরুকে GPS লোকেশন নির্ণয় করতে ব্যবহার করা হয়।

তাহলে কি উলটে যাচ্ছে উত্তর মেরু?

চুম্বকীয় উত্তর মেরুর এমন দ্রুত পরিবর্তনে চৌম্বক মেরুর উলটে যাওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে।  যদিও এমন ঘটনা অনিবার্য তারও তেমন কোন উপযুক্ত প্রমাণ নেই। ভূতাত্ত্বিকরা পাথরের মাঝে চুম্বকীয় খনিজ বিশ্লেষণের  মাধ্যমে পৃথিবীর চৌম্বকীয় পরিবর্তনের ইতিহাস বুঝতে পারেন।

অতীতে বহুবার পৃথিবীর চুম্বকীয় মেরু উলটে গেছে। সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটে প্রায় ৭৮ লক্ষ বছরে পূর্বে। গত ৮৩ মিলিয়ন বছরে এমন ঘটনা ঘটেছে ১৮৩ বার। চুম্বকীয় মেরু উলটে গেলে যে  পৃথিবী ধ্বংসের ঘটনা ঘটবে এমন নয়। ফসিলের রেকর্ড ঘটে এমন কোনো তথ্য উপাত্ত পাওয়া যায় নি, যাতে কিনা প্রমাণ হয়, চুম্বকীয় মেরুর অবস্থান উলটে গেলে পৃথিবীর বুক থেকে প্রাণের চিহ্ন মুছে যাবে কিংবা অগ্ন্যুৎপাত ইত্যাদি ঘটবে।

তারপরেও চুম্বকীয় মেরুর উপর নির্ভরশীল প্রযুক্তিগুলোর উপর বিশাল প্রভাব পড়বে। সমগ্র পৃথিবীর ন্যাভিগেশন বা বিচরণ ব্যবস্থা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিবর্তন আসতে পারে। খুশির খবর হচ্ছে, সাধারণত মেরু দুটোর সম্পূর্ণ উলটে যেতে কয়েক সহস্র বছর লাগে। এরফলে আমাদের হাতে পর্যাপ্ত সময় রয়েছে এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর পরিকল্পনা করার। কে বলতে পারে, যখন এই মেরুর জায়গা অদল-বদলের ঘটনাটি ঘটবে  তখন মনুষ্য-জাতি আদৌ এই গ্রহে থাকবে কিনা?

তথ্যসুত্র –

১. ফোর্বস

২. www.ncei.noaa.gov 

Comments are closed.