বিষ্ময়কর “পাই গ্রহ”!

শনি, মঙ্গল, পৃথিবী কত গ্রহেরই তো নাম শুনেছেন। কিন্তু কখনো কি পাই গ্রহ বলে কিছু আছে সেটা খেয়াল করেছেন? হয়ত খুব সম্ভবত না। বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মত আবিষ্কার করলেন পৃথিবী সদৃশ বা এক্সোপ্ল্যানেট “পাই আর্থ” বা পাই পৃথিবী। পাই নামকরণের প্রধান কারণই হলো গ্রহটি স্বীয় নক্ষত্রকে প্রতি ৩.১৪ দিনে একবার প্রদক্ষিণ করে!

প্রতিটি এক্সোপ্ল্যানেটই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে আলাদা। তাদের রয়েছে নানাবিধ ধর্ম। কিন্তু সম্প্রতি আবিষ্কৃত এক্সোপ্ল্যানেট যা পৃথিবী থেকে ১৮৬ আলোকবর্ষ দূরে সেটির রয়েছে খুবই চমকপ্রদ কিছু বৈশিষ্ট্য যা ইতোমধ্যে আপনারা বুঝে গিয়েছেন। এটার আকার প্রায় পৃথিবীর সমান এবং তাঁর সূর্যকে প্রতি ৩.১৪ দিনে একবার ঘুরে আসে যা গাণিতিক ধ্রুবক, সবার পরিচিত পাই এর মানের সাথে খুব বশি সাদৃশ্যপূর্ণ(পাই হচ্ছে সেই ধ্রুবক সংখ্যা যা পাওয়া যায় কোনো বৃত্তের পরিধিকে তাঁর ব্যাসার্ধ দ্বারা ভাগ করলে)। এক্সোপ্ল্যানেটটির অফিশিয়াল নাম হচ্ছে কে-২-৩১৫বি এবং আবিষ্কারকরা ডাক নাম দিয়েছেন পাই পৃথিবী! ২০১৭ সালে প্রথম এই এটির অস্তিত্ব বুঝতে পারেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যখন কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ  দ্বিতীয় বর্ধিত অনুসন্ধান কাজ চালচ্ছিল। প্রথমে ছোটো খুবই ক্ষীণ লাল বামন তারাটিকে সনাক্ত করেন। সেই তারাটির বেশ কিছু ট্রান্সিট বা ইন্টারভালের ডাটা সংগ্রহ করা হয়। এটার মানে হচ্ছ কোনো গ্রহ যদি তারাটিকে প্রদক্ষিণ করে তাহলে তা বুঝার জন্য উপযুক্ত উপায়। কিন্তু একটা ট্রান্সিটের তথ্য দিয়েই নিশ্চিত হওয়া যাবেনা এটি একটি এক্সোপ্ল্যানেট। তাই জ্যোতির্বিজ্ঞানী প্রাজওয়াল নিরাওয়ালা তাঁর দল নিয়ে বছরের প্রথম দিকে SPECULOOS পদ্ধতির মাধ্যমে গবেষণা শুরু করেন।

SPECULOOS হচ্ছে একটা বিশেষ টেলিস্কোপ সমন্বয়ে গঠিক নেটওয়ার্ক পদ্ধতি যা একসাথে কাজ করে ও পৃথিবী সদৃশ এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কার করে থাকে। ফেব্রুয়ারি, মার্চ এবং মে তে হওয়া তিনটে অবজারভেশনের পর বিজ্ঞানীরা SPECULOOS কে K2-315 তারার দিকে তাক করেন। সেখানে দেখা যায় বিশেষ ধরনের আবর্তন রেখা এবং তারার বিকিরণ যা সম্পূর্ণ ভাবে 3.14 দিনের ব্যবধানে সম্পর্কযুক্ত। HIRES প্রজেক্টের যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে এই বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। ঠিক তিন বছর আগে কেপলার টেলিস্কোপ এই মান গুলিই পেয়েছিল। তাছাড়াও নক্ষত্রটির বিকিরণ থেকে পরিপূর্ণ ভাবে নিশ্চিত হওয়া যায় যে একটি এক্সোপ্ল্যানেট সেটিকে প্রদক্ষিণ করছে। স্টেলার ট্রানসিট থেকে অনেক কিছুই বলা যায়। শুধুমাত্র নক্ষত্র থেকে আসা আলোর পরিমাণ থেকেই বলে দেয়া যায় সেটির এক্সোপ্ল্যানেটটি কত বড় বা ছোটো। এভাবেই জ্যোতির্বিদ নিরাওয়ালা এবং তাঁর সহকর্মীরা জানান যে গ্রহটি পৃথিবীর আকারের প্রায় ৯৫ শতাংশ মিল রয়েছে।

প্রাথমিক পরীক্ষা নিরিক্ষায় ধারণা করা হচ্ছে গ্রহটি পাথুরে যেমনটা পৃথিবী,শুক্র বা বুধের মত অন্যান্য গ্রহগুলো। কিন্তু অন্যান্য ফর্মেশন সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি এখনও। সেজন্য আমাদের প্রয়োজন ডপলার স্পেক্ট্রোস্কোপি। তাহলে আমরা জানতে পারব একটা গ্রহ কতটা দূরে বা কাছে দিয়ে আবর্তন করছে, তাঁর চলনের গতি এবং দিক ও সে সংক্রান্ত তরঙ্গদৈর্ঘ্য এর হিসাব। নক্ষত্রটির চলন ও গতিপথের হিসাব থেকেই মহাকর্ষের হিসাব কষে এক্সোপ্ল্যানেটের ভর বের করা যাবে। গ্যাস দানব গ্রহ গুলোর ঘনত্ব সবসময় কম হয়। সুতরাং যদি কোনো বৃহৎ আকৃতির গ্রহের ভর তুলনামূলক ভাবে কম হয় তাহলে ধরে নেয়া হয় এটি গ্যাসীয়। পাথুরে গ্রহ গুলো অনেক বেশিই ঘনত্বের হয় এবং ভরও বেশি থাকে। আবিষ্কৃত গ্রহটিও পাথুরে তবে এখন পর্যন্ত সেখানে কোনো জীবন থাকতে পারে কীনা তা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পাই সংখ্যক আবর্তন সময়ের পাশাপাশি গ্রহটির ঘূর্ণন গতি প্রায় ৮০ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ডে(পৃথিবীর ২৯ কিলোমিটার) এবং এটি নক্ষত্রের খুব কাছাকাছি আবর্তন করে। যার ফলে গ্রহের পৃষ্ঠ তাপমাত্রা অসম্ভব বেশি; প্রায় ১৭৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর কাছাকাছি!

যেহেতু গ্রহটি খুব সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে তাই এখনও জ্যোতির্বিদরা অনেক কিছুই জানেন না এটি সম্পর্কে। গ্রহের বায়ুমণ্ডল নিয়ে পরীক্ষা করাও হবে অত্যন্ত চমকপ্রদ এক ব্যাপার। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপটি লঞ্চ হলে আরো বিস্তৃত এবং বিষদভাবে গ্রহটিকে জানা যাবে। তাই এখন শুধু অপেক্ষার পালা এবং অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়া এরকম সম্ভাবনাময় চমকপ্রদ এক্সোপ্ল্যানেট গুলো খুঁজে পাওয়ার!

তথ্যসূত্র: sciencealert

Comments are closed.