পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা জঞ্জাল সাফ করতে আসছে নতুন প্রযুক্তি

যারা মহাকাশের ব্যাপারে মোটামুটি জানেন তারা স্পেস ডেব্রি (Debris) নামটাও চেনেন। এও হয়তো জানেন এই স্পেস ডেব্রি কি। সাধারণ কথায় স্পেস ডেব্রি বলতে মহাকাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রাকৃতিক ডেব্রি বা টুকরো টাকরা পাথরখন্ডকেই বুঝাই। তবে দিন দিন যত মহাকাশযান পৃথিবীর বাইরে পাঠানো স্যাটেলাইট স্থাপনের মাত্রা বেড়েছে, সেই সাথে এই সংজ্ঞাটিও বদলেছে। বর্তমানে স্পেস ডেব্রির আরেকটা ঝামেলাপূর্ণ অংশ হচ্ছে পৃথিবীর Orbital Debris বা কক্ষপথের জঞ্জাল। এই কক্ষপথের জঞ্জাল বলতে প্রাকৃতিক জঞ্জাল হিসেবে ভরে থাকা ছোটখাটো নুড়িপাথর বাদেও বিভিন্ন মহাকাশযানের খণ্ডাংশ (Spent Rocket Stages), মহাকাশজানের খণ্ডাংশ আর বাতিল স্যাটেলাইটগুলোর ভাঙাচুরা অংশকে বুঝায়। ২০১৬ সালের ৫ জুলাইয়ে দেয়া United States Strategic Command এর তথ্যমতে,

পৃথিবীর কক্ষপথে ১৭,৮৭২ টা কৃত্রিম বা মানবনির্মিত বস্তু ট্র্যাক করা হয় যার মাঝে ১৪১৯টি সক্রিয় স্যাটেলাইটও ছিল। এ তো গেল কেবল বড়সড় বস্তুগুলোর কথা যা ট্র্যাক করা বেশ সহজ। পিচ্চিপাচ্চি বস্তুর ব্যাপারে বলতে গেলে বলতে হয় ২০১৩ সালের জুলাই মাসের পরিসংখ্যান মতে ১ সেন্টিমিটারের চেয়ে ছোট কক্ষপথের জঞ্জালের সংখ্যা প্রায় ১৭০ মিলিয়ন বা ১৭কোটি, ১-১০ সেন্টিমিটারের ৬৭০,০০০ (ছয় লাখ সত্তর হাজার) এবং তার চাইতে বড়গুলো সংখ্যায় প্রায় ২৯,০০০!

 

ভাবুন একবার, এত জঞ্জাল নিয়ে মহাকাশে কাজ করতে কারই বা ভাল লাগবে?

অর্বিটাল স্পেস ডেব্রি হটানোর জন্যে কি ব্যবস্থা নেয়া হল তার আগে খানিক জেনে নেই এই ডেব্রি বা জঞ্জালগুলো কেন সরানো প্রয়োজন।

কারণ, এই জঞ্জালগুলো মহাকাশযান, বিশেষকরে মহাকাশে কাজ করার জন্যে যানের বাইরে অবস্থানের সময় সময় (spacewalk) মহাকাশযাত্রী, বিভিন্ন স্যাটেলাইট এর অংশ, বিশেষত সোলার প্যানেল আর টেলিস্কোপের আয়নার (mirror) জন্যে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কেননা এই জঞ্জালগুলোর একেকটার ছুটে চলার গতি গড়ে সেকেন্ডে সাড়ে সাত কিলোমিটারেরও বেশি! অর্থাৎ এরা এক সেকেন্ড এ সত্তর থেকে আশিটা স্টেডিয়াম সমান দূরত্ব অতিক্রম করে! যা পৃথিবীর যেকোনো বুলেটের গতির চাইতেও বেশি! মাঝেমাঝে এই গতি সেকেন্ড এ ১০ কিলোমিটার বা তারচাইতেও বেশি হয়ে যায়! যেমন ২০০৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তারিখে ৯৫০কেজির নিষ্ক্রিয় Kosmos 2251, 560 কেজি ওজনের সক্রিয় Iridium 33 স্যাটেলাইটের সাথে সেকেন্ডে ১১.৭ কিলোমিটার বেগে সংঘর্ষিত হয়। ঘটনাটি ঘটে সাইবেরিয়ার ভূখণ্ড থেকে সরাসরি ৮০০ কিলোমিটার উপরে। ভাবুন একবার, এই গতিতে যদি একটা বিস্কুটের বাক্সের সাইজের ফুটখানেক বড় ধাতব বা প্রস্তর কিছুও এসে আঘাত হানে কোনো মহাকাশযানে বা স্যাটেলাইটে সেটার কি অবস্থা হতে পারে! আর স্পেসওয়াকে থাকা মানুষের সাথে সংঘর্ষের ব্যাপার তো বাদই দিলাম! যেখানে একটা বুলেটের ধাক্কায় মানুষ ছিটকে পড়ে, এমনকি মৃত্যুবরণ করতে পারে সাথে সাথে।

এ তো গেল মহাকাশে সংঘর্ষের ব্যাপার৷ অনেকসময় বড়সড় উচ্ছিষ্ট কোনোরকমে আয়নমণ্ডলের ধকল সহ্য করে গিয়ে ঢুকে পড়তে পারে ভেতরের বায়ুমণ্ডলে। তখন তা কারো উপর আছড়ে পড়লে কি হতে পারে ভাবুন একবার!

১৯৬৯ সালে স্পেস ডেব্রির আছরে পড়ার কারণে ৫জন জাপানী নাবিক আহত হোন। ১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমার বাসিন্দা Lottie Williams এর ঘাড়ে এসে আঘাত হানে সেই সুদূর কক্ষপথ থেকে আছড়ে পড়া ডেল্টা ২ রকেট এর অংশবিশেষ! ভাগ্যক্রমে মহিলা বেচে যান সেই যাত্রায়। এরকম বহু ঝুঁকি আসলে থেকে যায়।
আর রইলো মহাকাশে থাকা যানগুলোর কথা, সেগুলো নাহয় ছোটখাটো কয়েক সেন্টিমিটারের আঘাত সামলে ফেলতে পারে এবং ক্রমাগত সেগুলোর সাথে মোকাবেলা করেই চলে। কিন্তু বড় কিছু এসে আঘাত হানলে সব তছনছ হয়ে যেতে পারে। এমনকি স্পেসওয়াকে থাকা যাত্রীর স্যুটে যদি সামান্য বড় কোনো নুড়িপাথরও এসে হানা দেয়, তা স্যুট, চামড়া, পেশি আর হাড় ভেদ করে এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যাবে! এমনকি তা ছুটে আসতেও দেখা যাবেনা!

তো পাঠক বুঝতেই পারছেন অর্বিটাল ডেব্রিগুলোকে ঠিকানায় পৌঁছানোটা কেনো প্রয়োজন আর কতখানিই বা প্রয়োজন। এবার তাহলে চলুন দেখি বিজ্ঞানী সাহেবরা কি ব্যবস্থা নিয়েছেন এ ব্যাপারে।

মহাকাশে যেমন জঞ্জাল বেড়েছে, সেই হারে বাড়ছে স্যাটেলাইটের সংখ্যাও। বাড়ছে সংঘাতের ঝুঁকি৷ সেই ঝুঁকির সমাধান হিসেবে ইংল্যান্ড এর University of Surrey এর Surrey Space Centre বানিয়ে ফেলে একটি অদ্ভুত স্যাটেলাইট! এবং এর নাম দেয়া হয় Remove Debris Satellite। স্যাটেলাইট টি এইবছরেই পরীক্ষামূলক কাজের জন্যে স্পেস এক্স রকেটে করে পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠানো হয়। যা আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন থেকে গত ১৬ সেপ্টেম্বর রবিবার পরীক্ষামূলক অভিযানে অংশগ্রহণ নেয়। আর এই অভিযানেই ব্যবহার করা হয় Surrey Space Centre এর উদ্ভাবিত মহাজাগতিক জঞ্জাল পরিষ্কারক প্রযুক্তি!

আর এই প্রযুক্তিটা ছিল খুব সাদামাটা একটা জাল কিন্তু সিম্পলের ভেতর গর্জিয়াস আরকি!

যেহেতু এটা একটা পরীক্ষা ছিল তাই এখানে টার্গেট বা লক্ষ্যবস্তুটাও ছিল কৃত্রিম। এজন্যে মোটামুটি জুতার বাক্সের সমান আকারের একটা বাক্স ছাড়া হয় কক্ষপথে জঞ্জাল এর নমুনা এবং জালিকার লক্ষ্য হিসেবে। এরপর কিছুক্ষণ পর যখন সেটা আপনমনে ছুটে ছুটে ঘুরপাক খাচ্ছিলো কক্ষপথে, তখন নিক্ষেপ করা হয় জালিকাটি৷ এবং নিক্ষিপ্ত জালটি সফলভাবেই নমুনা বাক্সটিকে জাপ্টে ধরতে পুরোপুরি সক্ষম হয়! মানে তাদের পরীক্ষামূলক অভিযানটি পুরোপুরি সফল ছিল। মোহড়ায় ব্যবহৃত টার্গেটটির আয়তন ছিল ৮” x ৪” x ৪”। আর এটিকে ধরার জন্যে আগে একটা তিনফুট চওড়া বস্তু নিক্ষেপ করা হয় আকার অনুধাবনের জন্যে। এরপর স্প্রিং মেকানিজম ব্যবহার করে জাল ছুড়ে মারা হয়। সেই জাল ক্ষণিকের মাঝেই জাপ্টে ফেলে লক্ষ্যবস্তুকে। এবং পরিকল্পনা ঠিকঠাক থাকলে এভাবেই জালে আটকে লক্ষবস্তুকে বায়ুমণ্ডলের দিকে এগিয়ে দেয়া হবে। আর সবকিছুর হিসেব ঠিক থাকলে তা বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করতে গিয়েই আর দশটা অহরহ ছোট – মাঝারি আকারের বস্তুর মত ভস্মীভূত হবে।
Removdebri স্যাটেলাইটটি একটা মাঝারি আকারের রেফ্রিজারেটরের সমান যা Surrey Satellite Technology (SSTL) নামের প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করে, যা Removdebri কনসোর্টিয়ামেরই একটা অংশ।

মোহড়ার ব্যাপারে বিবিসি’কে বলতে গিয়ে SSC’র পরিচালক Guglielmo Aglietti বলেন, “এটা ঠিক সেভাবেই কাজ করেছে যেমনটা করবে বলেই আমরা ভেবেছিলাম।”

তিনি আরো বলেন যে “লক্ষ্যবস্তুটা এমনভাবে ঘুরছিল যেমনটা আপনি ভাবতে পারেন একটা বেপোরোয়া মহাকাশ জঞ্জালের ব্যাপারে। কিন্তু আপনারা স্পষ্টতই দেখেছেন জালটা এটাকে ধরেই ফেলেছে! এবং যেভাবে আমাদের পরীক্ষাটা পূর্ণ হল, তাতে আমরা বেজায় খুশি।”

পরীক্ষামূলকভাবে ছুড়া জালটি লক্ষ্যবস্তুকে নিয়ে আগামী কয়েকমাসের মধ্যে পৃথিবীপৃষ্ঠের দিকে আছড়ে পড়বে এবং বায়ুমণ্ডলের সাথে সংঘর্ষে ভস্মীভূত হবে।
রিমুভডেব্রি স্যাটেলাইটকে Space X Falcon 9 রকেটে করে চলতি বছরের এপ্রিলে ছোড়া হয়।
তখন the verge কে দেয়া এক বিবৃতিতে ডিরেক্টর গুগলিয়েমো আগলিয়েত্তি বস্তুটির সাদামাটা প্রযুক্তির ব্যাপারে বলতে গিয়ে বলেন, “আমরা ভেবেছি জাল আর বর্শা (harpoon) এর মত প্রযুক্তি খরচের দিক থেকে বেশ সাশ্রয়ী হবে।”
তিনি বলেন, “আমরা যদি সহজলভ্য প্রযুক্তি দিয়ে মোহড়াটা করতে পারি, তবে ব্যাপারটা হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকবে।

প্রশ্ন আসতে পারে, এই পরীক্ষামূলক মিশনে রিমুভডেব্রি টিম কেন আসল Spacejunk কে টার্গেট করেনি?!

এর জবাবে তিনি space.com কে দেয়া এক বিবৃতিতে বলেন যে, রিমুভডেব্রি টিম আসল কোনো মহাজাগতিক জঞ্জালকে ব্যবহার করতে পারবেনা কেননা আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী বিকল হওয়া /ভাঙা যন্ত্রাংশগুলো সেইসব প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি হিসেবেই পরিগণিত হয়৷ সেজন্যেই সেগুলো থেকে কোনোটাকে ধরা বেআইনি হতো।

এতে ব্যবহৃত জালিকাটি চুড়ান্তরুপে তৈরি করতে সময় লেগেছে ৬ বছর আর এই ছয় বছরে এটি বহু পরীক্ষা নিরীক্ষা, ইঞ্জিনিয়ারদের বহু হিসেব নিকেশের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। কেননা এমন প্রবল বেগে ছুটে চলা একটা বস্তুকে পাকড়াও করা কিন্তু সোজাসাপ্টা ব্যাপার নয়!

ও হ্যা, আরেকটা কথাতো বলাই হয়নি আপনাদের, এই রিমুভডেব্রী নামের পরিষ্কারক বাক্সতে কিন্তু একটা বর্শাও আছে। মানে হারপুন!
এটি ছুড়ে লক্ষবস্তুকে ভেদ করে আটকে দেয়ার কাজে ব্যবহৃত হবে। ঠিক যেমন আমরা অনেকসময় অনেক এ্যাকশন মুভিতে দেখতে পাই চলন্ত কিছুর মেকানিকাল হার্পুন ছোড়া হয়, এরপর তা গিয়ে ঐ যান বা বস্তুকে ভেদ করে আটকে যায়। এখানেও ঠিক একই কাজ করার উদ্দেশ্যে এর সাথে হারপুন দেয়া হয়েছে।

RemoveDebris এর ভবিষ্যৎ

রিমুভডেব্রীর ভবিষ্যৎ মহাকাশের অন্ধকারেও বেজায় উজ্জ্বল। ইয়ে, মানে এমন সিম্পলের মধ্যে গর্জিয়াস প্রযুক্তিকে কে না চাইবে ব্যবহার করতে? খরচও তুলনামূলক কম!
তাই একে নিয়ে আগামীতে আরো পরিকল্পনা করা হচ্ছে ইতোমধ্যেই। European Union (EU) এর অর্থায়নে প্রকল্পিত ১ কোটি ৮৭ লাখ মার্কিন ডলারের একটি মিশন ২০১৯ সালের গোড়ার দিকে শুরু করা হবে, যাতে অংশগ্রহণ করার কথা RemoveDebris প্রযুক্তির। এতে বহু জঞ্জালকে ট্র্যাক করে সেগুলো পাকড়াও করা হবে। সাথে ব্যবহার হবে হারপুনও। ব্যবহার করা হবে বিশালাকারের জাল। এরপর সেইসব জঞ্জালসহ এটি বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পথে ভস্মীভুত হবে।
সবকিছু ঠিকঠাকমত কাজ করোলে তুলনামূলক স্বল্প ব্যায়েতে এই প্রযুক্তি কাজে লাগে খুব অল্পসময়েই অনেক জঞ্জাল সাফ করে ফেলা যাবে পৃথিবীর আশপাশ থেকে।
অন্তত কোনো এলিয়েন শিপ আমাদের গ্রহের দিকে নজর দিলে বলতে না পারে, “ওরে বাবা, বাইরে থেকেই কি জঞ্জালে ভরা৷ ভেতরে এদের কি অবস্থা!”
তবে যাইহোক, এলিয়েন তাকাক বা না তাকাক, এটা একান্তই নিজ জাতীর জন্যেই বিজ্ঞানীদের দায়িত্ব, পৃথিবীর বাইরের দিকটাও পরিষ্কার রাখা। এবং আশাকরি তাদের এই পরিকল্পনা সফলভাবেই কাজে লাগবে।

আজ এপর্যন্তই। পরেরবার আবারো আসবো হয়তো নতুন কোনো বিষয় নিয়ে। ততক্ষণ ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন, আর নিজের খেয়াল রাখুন।
ও হ্যা, আর বিজ্ঞানবর্তিকার সাথেই থাকুন।

এই সব ডেব্রিস থেকে কতটুকু নিরাপদ আমরা? দেখে নিন এক নজরে।

কতটুকু নিরাপদ আমরা আকাশ থেকে নেমে আসা গ্রহাণুদের থেকে?

 

এই এপ্রিলে আকাশ থেকে খসে পড়লো একটি কৃত্রিম উপগ্রহঃ 

Tiangong-1, নিজ অরবিট ছেড়ে এগিয়ে আসছে পৃথিবীর দিকে

তথ্যসুত্রঃ

 

 

Comments are closed.